পিঁপড়াদেরও সমাজ, সংসার ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা রয়েছে

2018-05-21 13:03:44 Hridom Hasan 54

কোরআনের শব্দ বিশ্লেষণ আরবি ভাষারীতি বলছে, মানুষ যেমন বিবেকসম্পন্ন প্রাণী, পিঁপড়াও তেমনি বোধসম্পন্ন সামাজিক ও পরিশ্রমী প্রাণী। ইন্টারনেটভিত্তিক মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়ার মতে, পৃথিবীতে ২২ হাজার প্রজাতির পিঁপড়া রয়েছে। এর মধ্যে বিজ্ঞানীরা ১২ হাজার ৫০০ প্রজাতির শ্রেণিবিন্যাস করেছেন। পতঙ্গ বিজ্ঞানীদের মতে, পিঁপড়া একটি সামাজিক পতঙ্গ। মানুষের মতো পিঁপড়াদেরও সমাজ, সংসার ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা রয়েছে। নিজস্ব বাজার এবং উন্নত মানের যোগাযোগ ব্যবস্থাও রয়েছে তাদের মধ্যে। তারা খাদ্য সঞ্চয় করে। পচে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে শীতের দিনে তা রোদে শুকাতে দেয়। তাদের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ ঘটে এবং মানুষের মতোই তারা চরম প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে থাকে।

সূরা নামলের ১৮নং আয়াতে বর্ণিত আছে, ‘যখন সোলায়মান (আঃ) এবং তাঁর বাহিনী পিঁপড়ার উপত্যকায় পৌঁছায়, তখন এক নারী পিঁপড়া বলল, হে পিঁপড়েরা, তোমাদের গর্তে প্রবেশ কর। এমন যেন না হয়, সোলায়মান এবং তাঁর সৈন্যরা তোমাদের পিষে ফেলবে, তোমরা তা টেরও পাবে না।’ সোলায়মান (আঃ) পিঁপড়ার কথায় মৃদু হাসলেন। কোরআন যে সম্পূর্ণ বিজ্ঞানভিত্তিক একটি মহামূল্যবান গ্রন্থ এবং কোনো রূপকথার গল্প নয়, সূরা নামলের ওই ১৮নং আয়াতই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

পতঙ্গ বিজ্ঞানী ড. উইলসন পুরো পৃথিবী ঘুরে ৫০০ প্রজাতির পিঁপড়ার ওপর পর্যবেক্ষণ করে এ তথ্যগুলো নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, পিঁপড়া মানুষের মতোই তাদের মৃতদেহগুলো কবর দেয়। এরা দলবদ্ধভাবে বাস করে। একটি দলে তিন ধরনের পিঁপড়া থাকেÑ রানী পিঁপড়া, শ্রমিক পিঁপড়া এবং পুরুষ পিঁপড়া। এদের প্রত্যেকের কাজ ভিন্ন ভিন্ন। রানী পিঁপড়ার কাজ হলো ডিম পাড়া এবং বংশবৃদ্ধি করা। এরা দিনে গড়ে পনের শ ডিম পাড়ে। পুরুষদের একটিই কাজ, রানী পিঁপড়ার সঙ্গে থেকে সন্তান উৎপাদনে ভূমিকা রাখা। পিঁপড়ার আকারগত বেশ পার্থক্য রয়েছে। ০.০৩০ ইঞ্চি থেকে ২ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা পিঁপড়া আছে।

পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় যে পিঁপড়াটির জীবাশ্ম পাওয়া গেছে, সেটি ২.৪ ইঞ্চি লম্বা ছিল এবং এর ডানার বিস্তার ছিল ৫.৯ ইঞ্চি। অধিকাংশ পিঁপড়ার রং লাল ও কালো। তবে কিছু প্রজাতির পিঁপড়ার রং সবুজ। কিছু প্রজাতির পিঁপড়ার ওজন ১ আউন্সের ১০,০০০ ভাগের ১ ভাগ মাত্র। আর ৩৫২টি ক্ষুদ্র পিঁপড়া মিলে ওজন হয় মাত্র ২ গ্রাম। পুরুষ পিঁপড়ার পাখা থাকে কিন্তু রানী বা শ্রমিক পিঁপড়ার পাখা থাকে না। অনেক শ্রমিক পিঁপড়ার পেছন দিকে হুল থাকে; যার সাহায্যে এরা অন্যান্য প্রাণীর দেহে হুল ফোটায়। অবশ্য হুল ফোটানোর কিছুক্ষণ পরই এরা মারা যায়। অধিকাংশ পিঁপড়ার দুটি চোখ থাকে, এতে কয়েকটি লেন্স থাকে, যার সাহায্যে পিঁপড়া খুব ভালো দেখতে পায়, কিছু পিঁপড়ার অবশ্য তিনটি সাধারণ চোখ থাকে। এই চোখের প্রতিটিতে একটি করে লেন্স থাকে। পিঁপড়ার চোয়াল খুবই শক্ত। এরা চোয়ালকে আশপাশে নাড়াতে পারে। এর সাহায্যে এরা মাটি নাড়াতে পারে।

মাটি খোঁড়া, খাবার সংগ্রহ, বাড়ি তৈরি, যুদ্ধ করা, কামড় দেওয়া ইত্যাদি কাজ করে। নিশাচর প্রাণীদের মতো মাটির নিচে বাস করে কিছু পিঁপড়া দিনে দেখতে পায় না। কারণ এদের চোখে কোনো প্রতিবিম্ব গঠিত হয় না বলে এরা কেবল রাতেই ভালো দেখে। পিঁপড়াকে সবসময় ব্যস্ত থাকতেই দেখা যায়। পিঁপড়া কখন ঘুমায় তা কেউ বলতে পারে না। কারণ এদের চোখের পাতা নেই। তাই এরা চোখ বন্ধ করতে পারে না। পিঁপড়ার ফুসফুস নেই, ক্ষুদ্র একটি গর্তের সাহায্যে এরা শ্বাস নেয়। শীতকালে এদের শ্বাস প্রশ্বাস ও কার্যক্রম কিছুটা ধীর গতিতে চলে। কোনো কোনো পিঁপড়া ১৫ বছর পর্যন্ত বাঁচে। তবে বেশির ভাগ পিঁপড়া কয়েক মাসের বেশি বাঁচে না। পুরুষ পিঁপড়া সবচেয়ে কম সময় বেঁচে থাকে। রানী পিঁপড়া মারা গেলে পিঁপড়ার দল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, কারণ শ্রমিক পিঁপড়ার সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতা থাকে না।

পিঁপড়া একটি কলোনিতে বাস করে। একেকটি কলোনিতে কম করে হলেও ৪৩,০০০ পিঁপড়া থাকে। একটি কলোনিতে ৩ ধরনের পিঁপড়া থাকেÑ রানী, শ্রমিক ও পুরুষ পিঁপড়া। একেকটি কলোনিতে অনেক ঘর থাকে। এরা একেকটি ঘর একেক কাজে ব্যবহার করে। যেমন খাবার মজুদ, ডিম সংরক্ষণ করা, বাচ্চা পিঁপড়াদের যতœ নেওয়ার আলাদা আলাদা ঘর। রানী পিঁপড়াদের জন্য থাকে আলাদা ঘর, এমনকি কোনো কোনো কলোনিতে কারখানাও থাকে। পিঁপড়ারা ময়লা আবর্জনার ঢিবির মধ্যে কলোনি নির্মাণ করে। এরকম একটি কলোনি নির্মাণ করতে প্রায় ১০ থেকে ১২ বছর সময় লাগে, আর মাটি লাগে প্রায় ৪০ টন।

গাছের পাতা, পচা কাঠ, কাদা ইত্যাদি সংগ্রহ করে মুখের লালার সঙ্গে মিশিয়ে ছোট ছোট টুকরো বানিয়ে তা দিয়ে বাড়ি তৈরি করে। পিঁপড়ারা ৪০-৫০তলা পর্যন্ত বাড়ি তৈরি করে থাকে। পিঁপড়াদের তৈরি বিশালাকার কলোনিকে সুপার কলোনি বলে। দক্ষিণ ইউরোপের ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগর বরাবর ৬,০০০ কিলোমিটার লম্বা একটি সুপার কলোনির সন্ধান পাওয়া গেছে। সুপার কলোনিতে ছিল জাপানের হোক্কাইডোর ইশিকারি উপকূল। এই সুপার কলোনিতে কর্মী পিঁপড়া ছিল ত্রিশ কোটি ষাট লাখ। রানী পিঁপড়া ছিল ১ লাখ। ২.৭ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই সুপার কলোনিতে পিঁপড়ার বাসার সংখ্যা ছিল ৪,৫০০০। পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত হলো সৈনিক পিঁপড়া। এরা দলবেঁধে চলে। এদের এক একটি দলে বিশ লাখ পিঁপড়াও থাকতে পারে। কোনো কোনো সময় সৈনিক পিঁপড়ার সারি মাইলের পর মাইল ছড়িয়ে থাকে। এদের সবচেয়ে বেশি দেখা যায় মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায়। আফ্রিকায় সৈনিক পিঁপড়াকে বলা হয় চালক পিঁপড়া। আক্রমণাত্মক আচরণের জন্য পৃথিবীর প্রায় ২০০ প্রজাতির পিঁপড়াকে সৈনিক পিঁপড়া নামে ডাকা হয়।

গন্ধ অনুসরণ করে পিঁপড়া খাবারের সন্ধান করে। পিঁপড়াদের যোগাযোগের মাধ্যম খুবই চমৎকার। একে অপরের শরীর ছুঁয়ে যোগাযোগ রক্ষা করে এরা। এছাড়াও পরস্পরের শুঁড় স্পর্শ করেও নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করে। এরা অনেক দূর থেকে খাবারের গন্ধ পায়। স্বাদ, গন্ধ এবং স্পর্শ এই তিনভাবে পিঁপড়া বুঝতে পারে তার আশপাশে কি আছে। পিঁপড়াদের যে সারিবদ্ধভাবে চলতে দেখা যায়, তার মূল কারণ হলো গন্ধ ও দূরত্বের হিসাব। পিঁপড়া তার ওজনের ৫০ গুণ বেশি ওজনের বস্তু বহন করতে পারে। আকৃতিতে ক্ষুদ্র হলেও লাল পিঁপড়া বা বিষ পিঁপড়া নামে পরিচিত পিঁপড়াদের রয়েছে চরম একতা। পিঁপড়ার যথেষ্ট স্মরণশক্তি রয়েছে। ফরাসি জীববিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন যে, দুটি আলাদা প্রজাতির পিঁপড়া একসঙ্গে তিন মাস রাখার পর আলাদা করা হলে ১৮ মাস পরও তারা একে অন্যকে চিনতে পারে। আজব এক ধরনের পিঁপড়া হলো পাতা পিঁপড়া। এরা বাস করে দক্ষিণ-পূর্ব আমেরিকা আর মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায়, পাতা কাটা পিঁপড়ার চোয়াল খুবই শক্তিশালী। পাতা কাটা পিঁপড়া নিজেরাই নিজেদের খাবার চাষ করে। এদের খাবার হলো এক ধরনের ছত্রাক।

ডুইসবুর্গ এসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিদ শ্রাইবার বলেন, পিঁপড়ার মধ্যে যারা আগাম বিপদ সংকেত বলতে পারে শুধু তারাই ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকার আশপাশে বাস করে। কারণ এসব অঞ্চল এদের জন্য কমফোর্টেবল। এদের বেঁচে থাকার জন্য অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও উষ্ণতা প্রয়োজন, যা শুধু এসব এলাকাগুলোতেই পাওয়া যায়। জার্মানের পতঙ্গ বিজ্ঞানী ওলরিশ বলেন, পিঁপড়া আগাম বিপদসংকেত বুঝতে পারে এবং নিজেদের বাঁচানোর জন্য সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। তবে ওলরিশের দাবি শুধু লালচে বিশেষ শ্রেণির নারী পিঁপড়াই এমনটি করতে পারে। প্রযুক্তির রাজধানীখ্যাত জাপান এবং জার্মানি সব প্রযুক্তি কাজে লাগিয়েও যখন ভূমিকম্প রোধে সফল হলো না, তখন তারা প্রকৃতির দারস্থ হলো। জার্মান বিজ্ঞানীরা ২ বছর ধরে অনবরত ভিডিও ক্যামেরার মাধ্যমে পিঁপড়ার গতিবিধি লক্ষ করেন। তারা দেখেন, ভূমিকম্পের ঠিক আগ মুহূর্তেই পিঁপড়াদের অস্থিরতা লক্ষণীয়ভাবে বেড়ে যায়। পাল্টে যায় তাদের গতিবিধিও।